অরক্ষিত স্বাধীনতাই পরাধীনতা – মেজর এম এ জলিল নতুন রাজনীতি
অরক্ষিত স্বাধীনতাই পরাধীনতা – মেজর এম এ জলিল

অরক্ষিত স্বাধীনতাই পরাধীনতা – মেজর এম এ জলিল

সারসংক্ষেপ

মেজর (অব:) এম. এ. জলিল (বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে ৯নং সেক্টরে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন)
** ভারত কি সত্যিই বিশ্বস্ত বন্ধু?
ভারত মুক্তিযুদ্ধে সকল অস্ত্র দিয়েছে একথা সত্য নয়। প্রবাসী বাংলাদেশ সরকারের অর্থেও প্রচুর অস্ত্র ক্রয় করা হয়েছিল। সে অস্ত্র সম্পদ মুক্তিযুদ্ধেরই সম্পদ ছিল। মুক্তিযুদ্ধের সম্পদ ভারতীয় সেনাবাহিনীর হাতে সমর্পণ করার কোনই যুক্তি ছিল না।
আসলে ভারত বাংলাদেশে অভিযান পরিচালনা করার সিদ্ধান্ত গ্রহণের সাথে সাথেই মুক্তিযোদ্ধাদেরকে নিরস্ত্র করতে চেয়েছিল যাতে তাদের অপকর্মের বিরুদ্ধে মুক্তিযোদ্ধারা যেন কোনরূপ সশস্ত্র প্রতিরোধ গড়ে তুলতে সক্ষম না হয়। কিন্তু যুদ্ধ বিজয়ের চূড়ান্ত মুহূর্তে কোন যোদ্ধাই সহজে নিরস্ত্র হতে চায় না। ভারতীয় কর্তৃপক্ষের কাছে অস্ত্র তুলে দেব না এই বিদ্রোহের বাণীই ছিল সেদিন প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধাদের মুখে। ভারতের মাটিতে দাঁড়িয়েই বিদ্রোহ করেছিলেন কেউ কেউ। ভারতীয় কর্মকর্তাগণ তাদের দু:সাহসকে হয়ত মনেপ্রাণে সেদিন ঘৃণা করেছেন এবং তাদেরকে ‘উচিত শিক্ষা’ দেয়ারও হয়ত পরিকল্পনা করে রেখেছিলেন।
প্রবাসী সরকারের প্রধানমন্ত্রী জনাব তাজউদ্দীন আহমদ এবং সর্বাধিনায়ক কর্ণেল ওসমানী সাহেবও আমার (লেখকের) সাহসের তারিফ না করে দুর্বল চিত্তে নসীহত করতে ছাড়েননি। কিন্তু দেশ-মাতৃকার মুক্তিযুদ্ধের লড়াকু হিসেবে আমি (লেখক) কারো করুনায় ভর করে বেঁচে থাকার চেয়ে বীরের মত মৃত্যু বরণ করাকে শ্রেয় মনে করেছিলাম। সেদিন এই দেশপ্রেমজনক অপরাধের জন্য ভারতের মাটিতেই আমার (লেখকের) মৃত্যু হতে পারত।
** বাংলাদেশে ভারতীয় বাহিনীর পরিকল্পিত লুন্ঠন:
১৬ ডিসেম্বরের পরে বাংলাদেশে ভারতীয় সেনাবাহিনী কর্তৃক ব্যাপক লুন্ঠন প্রক্রিয়া ভারত এবং তার তাবেদার গোষ্ঠীর দৃষ্টিতে মোটেও অপরাধযোগ্য ছিল না। কারণ বিজিত ভূখন্ডে বিজয়ী সেনাবাহিনী কর্তৃক সম্পদ লুটতরাজ করাকে আনন্দ-উল্লাসেরই স্বত:স্ফূর্ত বহি:প্রকাশ বলে বিবেচনা করা হয়।
স্বাধীনতার ঊষালগ্নে ভারতীয় সেনাবাহিনী কর্তৃক বাংলাদেশের সম্পদ লুন্ঠন প্রক্রিয়াকে যারা উপরোক্ত দৃষ্টিতে বিবেচনা করেন, তারা প্রকারান্তরে এ সত্যটিই স্বীকার করে নিয়েছেন যে, বাংলাদেশ ভারতীয় সেনাবাহিনী কর্তৃক একটি বিজিত ভূখণ্ড মাত্র।
আর যারা ১৬ ডিসেম্বরকে বাঙালির ‘বিজয় দিবস’ এবং বাংলাদেশকে সত্যিকার অর্থে স্বাধীন সার্বভৌম বলে মনে করেন এবং একথাও বলেন যে, স্বাধীনতার পরে বাংলাদেশে ভারতীয় সেনাবাহিনী কোন সম্পদ লুটতরাজ করেনি, তারা যে ভারতের কোন দোষত্রুটিই অনুসন্ধান করতে রাজী নয় এ কথা বলার আর অপেক্ষা রাখে না।
কিন্তু যারা দেশপ্রেম সমৃদ্ধ মুক্তিযোদ্ধা, সত্যান্বেষী এবং মুক্তিপিপাসু তারা নিজেদের ভূখণ্ডকে মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়েই স্বাধীন করেছে বলে বিশ্বাস করে, তারা বাংলাদেশকে ভারতের বিজিত ভূখন্ড বলে কখনই মনে করে না। তারা মনে করে ভারতের সম্প্রসারণবাদী প্রতিক্রিয়াশীল শাসক গোষ্ঠী মুক্তিযুদ্ধের শেষ পর্বে সমগ্র মুক্তিযোদ্ধার ভয়ে ভীত হয়েই বাঙালির স্বাধীনতার গৌরবকে জবরদখলের মধ্য দিয়ে নিজেদের হীন স্বার্থ উদ্ধার করেছে মাত্র। উপোরোক্ত ধ্যান-ধারনায় পুষ্ট দেশপ্রেমিক মুক্তিযোদ্ধারা ১৬ ডিসেম্বরের পরে মিত্র বাহিনী হিসেবে পরিচিত ভারতীয় সেনাবাহিনীকে নব্য স্বাধীন বাংলাদেশের বিভিন্ন সম্পদ মালামাল লুন্ঠন করতে দেখেছে। সে লুন্ঠন ছিল পরিকল্পিত লুন্ঠন; সৈন্যদের স্বত:স্ফূর্ত উল্লাসের বহি:প্রকারূপে নয়। সে লুন্ঠনের চেহারা ছিল বীভৎস-বেপরোয়া।
পাকিস্তানী বাহিনী কর্তৃক পরিত্যক্ত কয়েক হাজার সামরিক-বেসামরিক গাড়ি, অস্ত্র, গোলাবারুদ সহ আরো অনেক মূল্যবান জিনিসপত্র ট্রাক বোঝাই করে নিয়ে যাওয়া হচ্ছিল। ‘প্রাইভেট কার’ পর্যন্ত রক্ষা পায়নি। কথিত মিত্র বাহিনীর এই ধরনের আচরণ জনগণকে ভীত-সন্ত্রস্ত করে তুলেছিল। বাংলাদেশে প্রবেশের সাথে সাথেই যাদের শ্রী এমন, তারা যদি বাংলাদেশ ত্যাগ না করে বাংলাদেশের মাটিতেই অবস্থান করতে থাকে, তাহলে কি দশা হবে দেশ ও জাতির। একটা রক্ষক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে এ কোন ধরনের স্বাধীনতা অর্জন করলাম আমরা- এ ধরনের নানান প্রশ্ন দেখা দিল জনমনে।
আমার (লেখকের) প্রতিপক্ষ ভারতীয় সেনাবাহিনীর অধিনায়ক মেজর জেনারেল দানবীর সিং-কে আমি সতর্ক করে দিয়ে বললাম, ‘দেখা মাত্র গুলির হুকুম দিয়েছি আমি। ভারতীয় সেনাবাহিনীকে লুটতরাজ করা হতে বিরত রাখুন।’ জেনারেল দানবীর আমার (লেখকের) হুঁশিয়ার বাণী খুব হালকাভাবে গ্রহণ করে এমন ভাবখানা দেখালেন যেন আমি তাঁরই অধীনস্ত একজন প্রজা মাত্র।
রাজনীতি